,

আমন চাষ নিয়ে বিপাকে কৃষক

হাওর বার্তা ডেস্কঃ শ্রাবণ মাস শেষ হতে চলেছে অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ। বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকরা জমিতে আমন ধান রোপণ করতে পারছেন না। অনেক কৃষক আগাম আবাদের জন্য বীজতলায় চারা প্রস্তুত করলেও সেই চারা বীজতলাতেই নষ্ট হচ্ছে। অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে শ্যালোমেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে আমনের চারা রোপণ করছেন। এতে আবাদ খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সার এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষিতে অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক কৃষক বাড়তি খরচ করে জমি রোপণ করতে চাচ্ছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে চলতি মৌসুমে আমনের উৎপাদন অনেক কমে যাবে। আর তাতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এবার এক অস্বাভাবিক বর্ষা মৌসুম যাচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষার এই ভরা মৌসুমেও দেখা মিলছে না বৃষ্টির। তাপমাত্রা থাকছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। জুলাইয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে। গত ৩০ বছরে সবচেয়ে খরায় কেটেছে এবারের জুলাই মাসটি। গত ৩০ বছরে জুলাই মাসে বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের গড় ছিল ৪৯৬ মিলিমিটার; কিন্তু এবারের জুলাই মাসে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ২১১ মিলিমিটার। আগস্টেও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। দুদিন পর শেষ হচ্ছে শ্রাবণ। ঋতুচক্রের হিসাব অনুযায়ী বর্ষাকালও শেষ হবে। তবে আবহাওয়ার হিসাবে বর্ষাকাল থাকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এরপরই দেশ থেকে বিদায় নেয় বর্ষার বৃষ্টি ঝরানো দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতেও বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছুটা বৃষ্টি হতে পারে। তবে টানা বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আবহাওয়া অধিদফতর জুলাই মাসের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, জুলাইয়ে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃষ্টি কম হয়েছে। ওই মাসে তাপপ্রবাহ ছিল ১৮ দিন। জুলাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দিতে আবহাওয়া অধিদফতরের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি আগস্টের পূর্বাভাসে এরই মধ্যে জানিয়েছে, আগস্টে সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। এ মাসে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে মৃদু (৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এবার শুধু বাংলাদেশের বর্ষাকালই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। ফ্রান্সে ৬৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সারা বিশ্বেই একটা জলবায়ুজনিত পরিবর্তন ঘটেছে। সেখানে বাংলাদেশেও এর ছোঁয়া লেগেছে। এবার বর্ষাকালের চরিত্রে অস্বাভাবিক চরিত্র বিরাজমান।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি খাত। এখন ভরা মৌসুমেও বৃষ্টি নেই। খরায় পুড়ছে জমি। আবার দেখা যাবে যে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ফসলের জমি। এই চরম বৈরী আবহাওয়া যেমন কৃষকদের ভাবাচ্ছে, তেমনি সার ও জ্বালানি তেলের দাম তাদের চরম দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
চলতি মাসের প্রথম দিনে ইউরিয়া সারের কেজি প্রতি ছয় টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এরপর ৫ আগস্ট অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এতেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কৃষিতে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। না পারছেন কৃষি কাজ ছাড়তে, না পারছেন চালিয়ে যেতে।

কৃষকরা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতি ১ কাঠা (দশ শতাংশ) জমির হালচাষ খরচ ৩২০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা হয়েছে। এ বছর বৃষ্টি না থাকায় সেচের পানি খরচ ৫০০ টাকা, বাজারের খুচরা দোকানগুলোতে কেজিতে দু-তিন টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে, ধানের চারা রোপণের খরচ ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০০ টাকা হয়েছে, ধানক্ষেতের আগাছা পরিষ্কারের খরচ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা হয়েছে। অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েই গড়ে প্রতি দশ শতাংশ জমিতে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা হয়েছে।

এছাড়া সার নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে কারসাজি শুরু হয়ে গেছে। এখনই বাড়তি দাম নেওয়ার হিড়িক চলছে। আবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষিতে অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়ার কথা বলছেন প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিরা। এতকিছুর পর ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ করেন চাষিরা।

নেত্রকোনার সদর উপজেলার চরপাড়া গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ‘আমি এ বছর ৭ কাঠা (৭০ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করেছি। প্রতি দশ শতাংশে হালচাষ খরচ ২০০ থেকে বেড়ে ৪০০, ধানের চারা রোপণের খরচ ৪০০ থেকে বেড়ে ৬০০ টাকা হয়েছে। এ বছর বৃষ্টি না থাকায় শ্যালোমেশিনে পানি দিতে খরচ হবে ৫০০ টাকা, ক্ষেতে বিষ সার দিতে আগে খরচ হতো প্রতি কাঠায় ২৫০ টাকায় এখন লাগবে ৪৫০ টাকা। সরকার সার ও তেলের দাম বাড়িয়েছে। বড়লোক যারা আছে, তাদের চিন্তা নেই। সব খরচ সরকার এখন আমাদের মতো গরিব কৃষকের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এখন তো আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর