,

13

শিশুর কাঁধে পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমছে না

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সরকারপ্রধানের নির্দেশনা ও আদালতের রায়ের পরও শিশুদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমছে না। বরং সরকার অনুমোদিত বই ছাড়া হরেক রকমের বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করছে এক শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর ফলে শিশুরা বইয়ের ভারি ব্যাগ বহন করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ শিশুদের বইয়ের বোঝা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা আছে। এ ব্যাপারে হাইকোর্টেরও একটি রায় আছে।

আড়াই বছর আগে এ রায় দিয়ে একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু বাস্তবে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বইয়ের ‘আকার’ ছোট ও দু-একটি অফিস আদেশ ছাড়া আর কিছু হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রকাশিত বইয়ের আকার ও ওজন খুবই কম। সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনসিটিবি প্রকাশিত বইয়ের অতিরিক্ত পড়ানো হয় না। এর সঙ্গে খাতা থাকে। সব মিলিয়ে প্রথম শ্রেণীর বইয়ের ওজন হয়তো এক কেজিও হবে না।

তবে এটা ঠিক, কিছু কিন্ডারগার্টেন অযাচিত বই পাঠ্যভুক্ত করে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ওইসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ মানে না। তিনি আরও বলেন, তার যোগদানের পর অতিরিক্ত বই সংক্রান্ত আইন তৈরির ব্যাপারে আদালতের কোনো নির্দেশনা তার নজরে পড়েনি। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বাহারি নামের চটকদার বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি বইয়ের দাম আবার চড়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০-২৫ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। প্রথম শ্রেণীতে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের ওপর মাত্র তিনটি বই দেয়া হয়। কিন্তু এর বাইরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০টি পর্যন্ত পাঠ্যবই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

মিরপুরের মনিপুরে কিংশুক পার্টিসিপেটরি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ গিয়ে শিশুদের পিঠে বইয়ের বোঝা দেখা যায়। বিভিন্ন শ্রেণীর তুলনায় নার্সারি ও কেজি স্তরের শিশুদেরই বাড়তি বই বেশি। এর মধ্যে নার্সারি ক্লাসে ১০টি বই কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- শিশুদের বাংলা পড়া, লেখা শেখা, ছড়া বই, ইংলিশ, অক্ষর চেনা, ইংরেজি গ্রামার, সংখ্যা শিক্ষা, অঙ্ক, ছবি আঁকা ও আরবি শিক্ষা।

কেজিতে দেয়া হয়েছে- আমার সাথী বাংলা বই, এসো লেখা শিখি, ইংরেজি গ্রামার, মাই পিকচার ওয়ার্ড, মজার পড়া, অঙ্ক শেখা, পরিবেশ পরিচিতি নৈতিক শিক্ষা, এসো রং নিয়ে খেলা করি, আদর্শ হিন্দু ধর্ম শিক্ষা।

এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে ইংরেজি গ্রামার, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, সাধারণ জ্ঞান, আদর্শ হিন্দু শিক্ষা ও বিদ্যাকুঁড়ি ছবি আঁকা। প্রশ্ন উঠেছে নার্সারি, শিশু ও প্রথম শ্রেণীতে গ্রামার বা ব্যাকরণ পড়ানো কতটা জরুরি। এভাবে অন্যসব শ্রেণীতেও যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত বই।

ধানমণ্ডির ট্যানারি মোড়ে সবুজ-সখা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণীতে অতিরিক্ত তিনটি বই পাঠ্য করা হয়েছে। এগুলো হল- বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও ড্রইং। এ ছাড়া নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাইড কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউই কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করে শীর্ষ দু’জন কর্মকর্তা বলেন, তারা দায়িত্বে নতুন আসায় বিষয়টি অবগত নন। তবে তারা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত বই পাঠ্যভুক্ত করা হয় না। যেসব প্রতিষ্ঠান এটা করে সেগুলোর বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুল ও কলেজ। এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরেজমিন অবশ্য এ দাবির সত্যতাও মিলেছে।

মিরপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাড়তি বই দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত বাড়তি তিনটি করে বই পাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত বইয়ের মধ্যে আছে- কোর্সবুক, বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ইত্যাদি। অথচ এসব শ্রেণীর জন্য এ ধরনের বই সরকার পাঠ্যভুক্ত করেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর এমনকি জেলা-উপজেলার স্কুলেও একইভাবে অখ্যাত ও ভুইফোঁড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিুমানের বই পাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের চোখের সামনে এসব অপকর্ম করা হলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, অতিরিক্ত বই পাঠ্যভুক্ত না করার ব্যাপারে এনসিটিবি বছরের শুরুতেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সতর্ক করে। কিন্তু এরপরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর সহায়তা ছাড়া আদালতের আদেশ ও সরকারি সার্কুলার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

ঢাকায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এটা বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের একটি মনিটরিং কমিটি করা দরকার। আইনজীবী মাসুদ হোসেন দোলন যুগান্তরকে বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে আদালত এ আদেশ দেন। কিন্তু তা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর