,

gm kader-002_81453

গণতন্ত্রের ঘাটতি, ক্ষয়ক্ষতি ও উত্তরণ! গোলাম মোহাম্মদ কাদের

২০১৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রায় তিন মাসজুড়ে যে সহিংস আন্দোলন হয়েছে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি ব্যাপক। তা ছাড়া জীবনহানিসহ আনুষঙ্গিক ক্ষতিও কম নয়। এ বিষয়ে অনেক মতামত, অনেক তথ্যবহুল জরিপ ও সংখ্যাভিত্তিক ক্ষতির পরিমাণ গণমাধ্যমের মারফত জনগণ অবহিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ অবরোধ এবং হরতালকালীন (মোট আড়াই মাস) নিম্নরূপ।

সেক্টরভিত্তিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (কোটি টাকায়) :

গণতন্ত্রের ঘাটতি, ক্ষয়ক্ষতি ও উত্তরণ

(সূত্র : The Daily Star, April 6, 2015)

একই কারণে ৫ জানুয়ারি থেকে ২২ মার্চ, ২০১৫ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা ৯২, তন্মধ্যে ৬১ জন অগি্নদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ও মোট আহতের সংখ্যা ১৪০০। (সূত্র : The Daily Star, March 23, 2015.)

আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনটি সুষ্ঠু হয়নি ও সে কারণে দেশে ও বিদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি এটা অনস্বীকার্য। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ফলে সেসব দলের জন্য নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন পুনঃঅনুষ্ঠানের দাবি ও দাবি গ্রাহ্য না হলে আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন অযৌক্তিক বলা যায় না। তবে যে পদ্ধতিতে আন্দোলনটি পরিচালিত হয়েছে, বিশেষ করে সাধারণ জনগণের ওপর নির্মম সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দেশে বর্তমানে কাঠামোগতভাবে জবাবদিহিতাবিহীন সরকার চালু আছে। সরকারকে জনগণের তরফ থেকে দায়বদ্ধ করার জন্য সৃষ্ট সব প্রতিষ্ঠান কার্যত অকার্যকর। সংবিধানের দিক-নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল একই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, সাংবিধানিকভাবে বিরোধী দল সরকারের কোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অপারগ। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকারের জবাবদিহিতা গ্রহণের প্রধান প্রতিষ্ঠান সংসদ। সে দায়িত্ব পালনে সংসদ সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রতীয়মান হচ্ছে। সে সব কারণে জবাবদিহিতাবিহীন একদলীয় পদ্ধতিতে বর্তমান সরকার পরিচালিত হচ্ছে বলা যায়। এ ধরনের সরকার স্বৈরশাসনের জন্ম দেবে এটাই স্বাভাবিক। আর স্বৈরশাসন সুশাসন দিতে ব্যর্থ হবে ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটাবে এটা অবশ্যম্ভাবী। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কথা ‘Power corrupts, absolute power corrupts absolutely’.

সরকারের জবাবদিহিতার ঘাটতি আমাদের শাসন ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। হঠাৎ করে ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সময়ের বা কারণেই শুধু এটি চালু হয়েছে তা নয়। আবার ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক হলেই যে এ সমস্যার সমাধান হতো তাও নয়। এমনকি বর্তমান আন্দোলনের ফলে, যদি ভবিষ্যতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও হয় তবুও এ সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে না তা বলা যায় না। তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সুষ্ঠু হলে সরকারকে জনগণ তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাপকাঠিতে মাপতে পারে। সেভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে চূড়ান্ত জবাবদিহিতার গণ্ডিতে সরকারকে আটকানোর সুযোগ থাকে।

বর্ণিত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেড না নিয়েই ক্ষমতা দীর্ঘায়িত শুধু নয়, চিরস্থায়ী করা সম্ভব হবে, এ আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। দেশ বর্তমানে জবাবদিহিতাবিহীন চিরস্থায়ী স্বৈরশাসন কায়েমের পথে অগ্রসর হচ্ছে কিনা এ চিন্তায় জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত।

ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ দূর করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি, জবাবদিহিতাহীন স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে একটি পদক্ষেপ। সে অর্থে এ আন্দোলন গণতন্ত্রায়নের পথে পুনঃপ্রবেশের কর্মসূচি বলা যায়। বলা হচ্ছে. ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা এসব করছে। এ কথাটি অসত্য না হলেও অনেক বাড়িয়ে বলা। কেননা, নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ হলেই আন্দোলনকারীরা ক্ষমতায় যাবে এ নিশ্চয়তা কি? ভোটাররা নির্বাচনে তাদের পক্ষে রায় দিলেই শুধু তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে।

গণতন্ত্রের চর্চা যত উন্নত হবে, সরকারের জবাবদিহিতা ততই বৃদ্ধি পাবে। সে কারণে দুর্নীতির বিস্তার কম হবে এবং সুশাসনের মানও সে হারে বাড়তে থাকবে। গণতন্ত্রের চর্চা, জবাবদিহিতা, সুশাসন, দুর্নীতি এসবই পরস্পর নির্ভরশীল। দুর্নীতির বাড়া-কমার সঙ্গে বাকি তিনটির কমা-বাড়া নির্ভরশীল। বিশেষ করে দুর্নীতির বৃদ্ধি সুশাসনের অবনতি ও গণতন্ত্র চর্চার ঘাটতির লক্ষণ বলা যায়। সুশাসন মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে দুর্নীতি। যে দেশে দুর্নীতি যত কম সে দেশে সুশাসন তত ভালো। একইভাবে দুর্নীতি গণতন্ত্র চর্চার মূল্যায়নের সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে দেশে দুর্নীতির বিস্তার ব্যাপক ও অপ্রতিরোধ্য সেখানে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা নেই বলা যায়।

গণতন্ত্রায়নের অবক্ষয় সুশাসনের ক্রমাবনতি ঘটায়। জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ে। তা ছাড়া একই সঙ্গে এ অবস্থা দুর্নীতির ব্যাপকতা বাড়ায়। সম্পদের অপচয় ও অব্যবহার বৃদ্ধি করে জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশে বর্তমানে সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে আর্থিক ক্ষতি এবং জীবনহানির কিছু তথ্য নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :

সরণি ৩.৩ : ২০১০ এবং ২০১২ সালের জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত নিয়মবহির্ভূত অর্থের পরিমাণের তুলনামূলক চিত্র

(সূত্র : টিআইবি, সেবা খাত দুর্নীতি জাতীয় খানা জরিপ ২০১২)।

গণতন্ত্রের ঘাটতি, ক্ষয়ক্ষতি ও উত্তরণ

গণতন্ত্রের ঘাটতি, ক্ষয়ক্ষতি ও উত্তরণ

২০১২ সালে টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে সর্বমোট প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্র দুর্নীতি চিত্র পাওয়া যায়। ২০১০ সালে যা ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে বৃদ্ধির শতকরা হিসাবে ১০০%-এরও বেশি। যদি ধরে নেই পরবর্তী দুই বছরেও একই হারে বৃদ্ধি হয়েছে (যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়) তাহলে এসব খাতে দুর্নীতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ দুর্নীতি শুধু ছোট ছোট খুচরা দুর্নীতি। এই হিসাবে বড় বড় প্রকল্পসমূহে সম্ভাব্য সংঘটিত দুর্নীতি, ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি জমি-জমা এবং সম্পদসমূহ নামমাত্র মূল্যে হস্তান্তর বা ইজারা প্রদান ইত্যাদি এ ধরনের অন্যান্য দুর্নীতিসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ ক্ষুদ্র দুর্নীতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা পানিতে ভাসমান বরফ খণ্ডের দৃশ্যমান শীর্ষ অংশ মাত্র। মূল দুর্নীতির পরিমাণ এর বেশ কয়েক গুণ বেশি বলে ধারণা হয়।

দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবের কারণে অস্বাভাবিক প্রাণহানির চিত্র হিসাবে দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত বিগত সাত দিনের (১৬ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল, ২০১৫ পর্যন্ত) অপঘাতে মৃত্যুর চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো :

মৃতের সংখ্যা ১৬ তারিখ ২২ জন, ১৭ তারিখ ১৯ জন, ১৮ তারিখ ৩৯ জন, ১৯ তারিখ ১৩ জন, ২০ তারিখ ২২ জন, ২১ তারিখ ১৯ জন, ২২ তারিখ ২৫ জন। যার মোট সংখ্যা ১৫৯ জন। এর বাইরেও এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি এমন অনেক অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা থাকতে পারে। দুর্ঘটনাজনিত আহতের সংখ্যাও বেশ কয়েকগুণ বেশি বলা যায়।

অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের স্থায়িত্বের কারণে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা ও অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতির বিকাশ ঘটে। এ কারণে ক্রমান্বয়ে সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এত বড় হতে থাকে যে এ ধারাবাহিকতা রোধ করা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জনগণের কাছে অবশ্য করণীয় হিসেবে গণ্য হয়। সে উদ্দেশ্যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, ইতিহাস এর সাক্ষী। এ ধরনের যে কোনো আন্দোলন ও তাতে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে অযৌক্তিক বলে গণ্য হয় না। উপরের পরিসংখ্যানে এ আভাস পাওয়া যায়।

তবে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারলেই সরকারের দৈনন্দিন জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সে লক্ষ্য অর্জনে আমাদের শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংস্কারমূলক কিছু পরিবর্তন অপরিহার্য। যেমন সংসদসহ সরকারের নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা গ্রহণের প্রতিষ্ঠানসমূহকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে ও শক্তিশালী করতে হবে। বিরোধী দল সংসদ বর্জন করবে না। সরকার ও সরকারি দলের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট আড়াল থাকতে হবে। রাষ্ট্রকে সরকারি দলের অনুকূলে ব্যবহার করা পরিহার করতে হবে। সব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহিংসতা বর্জন করতে হবে ইত্যাদি। এ সবকিছু বাস্তবায়ন সম্ভব শুধু সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সে কারণে, সরকারি উদ্যোগে একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করা যায়।

রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়ার কথা জনগণের কল্যাণে কাজ করা। সেখানে জনগণকে বিপদগ্রস্ত করা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টিকারী রাজনীতি এবং একই পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী দমনের রাজনীতি জনগণের প্রত্যাশা নয়। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব মহলকে উপলব্ধি করতে হবে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় পার্টি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর