,

10

রাজনীতিতে উত্তরাধিকারী, আশার আলোকবর্তিকা সন্তানেরাও

হাওর বার্তা ডেস্কঃ রাজনীতিতে উত্তরাধিকার সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনেক দিনের। উপমহাদেশসহ পুরো বিশ্বেই চলে আসছে উত্তরাধিকারের ধারা। উত্তরাধিকার রাজনীতির উদাহরণ রয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহেও। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধরে রেখে রাজনীতিতে নতুন রক্তের সঞ্চালন হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। বাবা’র দেখানো পথে হেঁটে সংসদ সদস্য হয়েছেন ছেলে। বাবা’র মতো সন্তানেরাও রাজনীতিতে উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে হয়ে ওঠেছেন আশার আলোকবর্তিকা।

বঙ্গবন্ধু’র আমৃত্যু ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন দেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ‘বাংলার বুলবুল’ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। রক্ত কথা বলে, এ কারণেই হয়তো ছাত্র জীবনেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিজের ‘জাত’ চিনিয়েছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ওয়ান ইলেভেনে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্কটময় মুহুর্তে শিশার ঢালা প্রাচীরের মতো দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন।

কয়েক দফা ছিলেন দেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে। আপাদমস্তক সৎ এবং নিরেট ভদ্রলোক জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর) এ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের চারটি নির্বাচনে টানা চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের তিন সরকারেই তিনি মন্ত্রী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিপরীতে শক্তিশালী কোন প্রার্থী নেই। সামনের নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হবেন, মন্ত্রীত্ব পাবেন এমনটিই মনে করেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

আওয়ামী লীগের বর্ষীয়াণ রাজনীতিক, ‘ভাটির শার্দুল’ আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর শুন্য হওয়া কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসন থেকে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তাঁর রক্তের উত্তরাধিকার রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বাবা’র মতোই হাওরবাসীর কাছের মানুষ সংসদ সদস্য তৌফিক। তাঁর পরিচ্ছন্ন ইমেজ রয়েছে। গণমানুষের নেতা হিসেবে তিনি এলাকায় উন্নয়ন কর্মকান্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ আসন থেকে আব্দুল হামিদ সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তৌফিকই দলীয় প্রার্থী হবেন এটা নিশ্চিত।

কিশোরগঞ্জ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আসন রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন শক্তিমান রাজনীতিক জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ এ সহচর কিশোরগঞ্জ-৬ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভাটি অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কুলিয়ারচর উপজেলা আর বন্দরনগরী ভৈরব নিয়ে গঠিত এ আসনটিতে বাবা জিল্লুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হন ছেলে নাজমুল হাসান পাপন।

আওয়ামী লীগের ‘দুর্গ’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এ আসনটিতে টানা দু’বার সংসদ সদস্য হয়েছেন বিসিবি বস। প্রধানমন্ত্রী’র পরিবারের সঙ্গে পাপনের পরিবারের ঘনিষ্ঠতার কথা জানেন সবাই।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের টিকিটে ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসন থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য ও একবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি রাজনীতিক আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। বাবা’র ছায়া হয়ে রাজনীতিতে উঠে এসেছেন কনিষ্ঠ সন্তান ফাহমি গোলন্দাজ বাবেলও।

বাবা’র পদাঙ্ক অনুসরণ করেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হয়ে সাড়া জাগিয়েছিলেন ছেলে বাবেল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় পৌনে ২ লাখ ভোট পেয়ে তিনি এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ রাজনীতিক হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ‘বাবেল ক্রেজ’ রয়েছে। ডিজিটাল ও আধুনিক মনস্কের তরুণ রাজনীতিক হিসেবেও পরিচিতি আছে তাঁর।

ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে চারবারের সংসদ সদস্য প্রয়াত এম.শামসুল হকের সন্তান শরীফ আহমেদ বিএনপিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ভোটে তারাকান্দা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসন থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন। জেলা কৃষক লীগের ওই সময়কার সাধারণ সম্পাদক তুহিন আওয়ামী লীগ দলীয় সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মিসেস জাহানারা খান ও ময়মনসিংহের সিলেকশান গ্রেডের কর্মকর্তা, ঢাকার বাইরে প্রথম বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক জয়নুল আবেদীন খানের ছেলে। এ আসনে দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আব্দুস সালামকে টেক্কা দিয়ে রাজনীতিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে অবিরাম পথ চলছেন তরুণ এ সংসদ সদস্য।

ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দু’বার ছিলেন ময়মনসিংহ পৌরসভার মেয়র। তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান মোহিত উর রহমান শান্ত ময়মনসিংহ মহানগর আ’লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবি’র কাউন্সিলর। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। শান্তকে নিয়ে উন্মাদনা রয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মীদের। তবে বরাবরই শান্ত বলে আসছেন, সামনের নির্বাচনেও তাঁর বাবা প্রিন্সিপাল মতিউর রহমানই আ’লীগের প্রার্থী হবেন।

দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের সফল উদ্যোক্তা ও ময়মনসিংহের বিশিষ্ট শিল্পপতি আমিনুল হক শামীম। টানা তিনবার তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত এফবিসিসিআই’র নির্বাচনে পরিচালক নির্বাচিত হন। তিনি সক্রিয় রয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। তিনি জেলা আ’লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সভাপতি।

তাঁর ছোট ভাই মো: ইকরামুল হক টিটু ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সভাপতি। বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ ময়মনসিংহ পৌরসভার মেয়র। শান্ত-সৌম্য-হৃদয়বান মেয়র ইকরামুল হক টিটু তাঁর জামানায় একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত ময়মনসিংহ নগর গড়তে কাজ করছেন নিরন্তর। ভোটার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ছিলেন কবি মাহবুবুল হক শাকিল। প্রয়াত এ রাজনীতিক ছাত্রলীগের রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছিলেন। দমকা হাওয়ার মতো তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও শেখ হাসিনা অন্ত:প্রাণ ছিলেন এ রাজনীতিক। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক। ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন থেকে তাঁর মনোনয়নের আওয়াজ তুলেছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

নেত্রকোণা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত শক্তিমান রাজনীতিক জালাল তালুকদার। দলের চরম দু:সময়ে নেত্রকোণায় আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করেছিলেন জালাল তালুকদার। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর কন্যা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস। স্থানীয় এলাকায় তিনি ঝুমা তালুকদার নামেই পরিচিত।

সম্প্রতি নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের ঘোষিত কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন ঝুমা তালুকদার। দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা থেকে একমাত্র তিনিই দলটির কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য হয়েছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন রাজনীতিতে জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে এ নেত্রীর নাম।

সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন যুদ্ধের আগে ঝুমা’র দলীয় এ গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তিকে তাঁর কর্মী সমর্থকরা প্রাথমিক বিজয় হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। ঝুমার স্বামী মাসুদ খান জনি নেত্রকোণা জেলা যুবলীগের সভাপতি। জনির ভাই আরিফ খান জয় দেশবরেণ্য ফুটবলার ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর