,

5

হাওরের ২ নং পিআইসির ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ শেষ হয়নি

হাওর বার্তা ডেস্কঃ জেলার ১১ উপজেলার প্রায় দুই লাখ হেক্টর বোরো ফসল রক্ষার জন্য স্মরণকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবার। হাওর অঞ্চলে এত টাকার বরাদ্দ এবারই প্রথম দেয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত তারিখ শেষে আরও ১৫ দিন সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি বাঁধের কাজ। ১১৫ টি ক্লোজার এবং প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার বেরীবাঁধের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে ১৭৭ কোটি টাকা। বাঁধ নির্মাণ করছে ৯৬৪ টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)। তাদের অনুকূলে ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে ১২২ কোটি টাকা।

২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল বাঁধের কাজ শেষ হবার দিন। কিন্তু সেই সময় অধিকাংশ বাঁধেই ৫০ ভাগেরও বেশি কাজ না হওয়ায় পানি সম্পদ মন্ত্রণলয় থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত কাজের সময়সীমা বর্ধিত করা হয়। বর্ধিত সময়সীমা বৃহস্পতিবার পেড়িয়ে গেলেও বাঁধ নির্মাণে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি অনেক হাওরেই। জানা যায়, যেসব বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে সেগুলোতেও নীতিমালা অনুযায়ী কমপেকশন এবং স্লোপের কাজ হয়নি। ঘাস লাগানোর কাজ চলছে ঢিমেতালে। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে, বাঁশ, বস্তা, চাটাই, জিওটেক্সটাইল দেয়ার কাজ শুরু হয়নি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জামখলা হাওরের ২ নং পিআইসির ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। এই বাঁধে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল বন্ধের জন্য মাটি ফেলার কাজ চলছে। এই উপজেলার ৮০টি পিআইসির মধ্যে মাত্র দুইটি পিআইসির বাঁধে ঘাস লাগানো শেষ হয়েছে। কিছু প্রকল্পে ঘাস লাগানো চললেও অধিকাংশ প্রকল্পে ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হয়নি।

জগন্নাথপুরের পিআইসি ৯১ টি। মাটির কাজ এখন চলমান রয়েছে ৫-৭ টিতে। কয়েকটি পিআইসি ছাড়া অধিকাংশ পিআইসির বাঁধে ঘাস লাগানো হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ও ক্লোজারে বাঁশ, বস্তা ও চাটাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বৃহস্পতিবার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, সার্বিকভাবে বাঁধ নির্মাণ কাজ ৮৮ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। জামালগঞ্জের মোট পিআইসি ১০০ টি। এই উপজেলার সকল প্রকল্পের মাটির কাজ শেষ। তবে ঘাস লাগানোর কাজ শেষ হয়নি। হালির হাওরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার কালীবাড়ি। এই ক্লোজারের মাটির কাজ রাতা-রাতি শেষ করা হলেও দুর্মুজ-কমপেকশন সঠিকভাবে হয়নি।

জামালগঞ্জের হালির হাওরের কালিবাড়ি ক্লোজার, পাগনার হাওরের গজারিয়া ক্লোজার, মুচিবাড়ি ক্লোজার, বোগলাখালী ক্লোজার, শনি হাওরের নান্টুখালী ক্লোজার, ঝালখালী ক্লোজার, লালুর গোয়ালা ক্লোজারে এখনও জিওটেক্সটাইল দেয়া শেষ হয়নি। তবে দুই-একদিনের মধ্যেই জিওটেক্সটাইল দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন পাউবোর উপ সহকারি প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন দাস। জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শামীম আল ইমরান বললেন, আমাদের উপজেলার বাঁধগুলোতে মাটির কোন কাজ নেই। অধিকাংশ বাঁধে ঘাস লাগানো শেষ হয়েছে। জিওসেক্সটাইল দেয়ার কাজও দুই-এদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। সার্বিকভাবে ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে।
তাহিরপুর উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওরের মোট প্রকল্প ৯৭টি। এর মধ্যে শনির হাওরের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। মাটিয়ান হাওরের পুটিমারা ও বোয়ালামারা কম্পার্মেন্টাল বাঁধসহ ১০টি পিআইসির কাজ এখনও চলমান রয়েছে। তবে বৃহৎ দুইটি হাওরের কোন প্রকল্পেই ঘাস লাগানোর কাজ শুরু হয়নি। এ্ই উপজেলার বাঁধ ও ক্লোজারে জিওটেক্সটাইল ব্যবহার রাখা হয়নি।

ধর্মপাশায় মোট পিআইসি ১৩৪ টি, অধিকাংশ পিআইসির মাটির কাজ শেষ হলেও কোনো বাঁধেই ঘাস লাগানো শুরু হয়নি বলে জানা গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে বাঁশ, বস্তা ও চাটাই সঠিকভাবে দেয়া হয়নি। মধ্যনগরের চামরদানি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না বলেন,‘ গুরমার হাওরে ১৫ টি ও কাইলানী হাওরে ১০টি পিআইসি। এই দুইটি হাওরে অধিকাংশ পিআইসির কাজ সঠিকভাবে হয়নি। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি তোলা হয়েছে। কোন বাঁধেই সঠিকভাবে কম্পেকশন ও স্লোপ দেয়া হয়নি। এখনও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। একটি বাঁধেও ঘাস লাগায়নি পিআইসি।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মোট পিআইসি ৪১টি। বাঁধে ঘাস লাগানো হয়েছে চার ভাগের একভাগ। খরচার হাওরের হরিমনের ভাঙা ১০ নং পিআইসি, শনির হাওরের মাসুকের ও জালালের খাড়া ১৯ নং পিআইসি, শনির হাওরের ১৬ ও ২০ নং পিআইসি, আঙ্গরালী সনার হাওরের গন্ডামারা ৬ নং পিআইসির বাঁধে মাটি ফেলার কাজ এখনও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ক্লোজারগুলোতে বাঁশ, বস্তা ও চাটাই-এর কাজ ৭০ ভাগ হয়েছে। দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের কালধর সিমের গাছ থেকে বৈশাখীর পশ্চিমের ভাঙা পর্যন্ত ৫টি পিআইসি। এরমধ্যে ১টি মাটির কাজ শেষ হলেও ৪টি পিআইসির মাটির কাজ এখনও চলছে। গত বছর বৈশাখীর যে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকেছিল সেটির মাটির কাজ শেষ হয়নি। একই উপজেলার টাংনি হাওরের ৬৯, ৬৯ (ক) ও ৬৯ (খ) নং পিআইসির মাটির কাজ শেষ হয়নি। এই উপজেলার কোনো বাঁধেই ঘাস লাগানোর কাজ শুরু করেনি পিআইসি। হুরা মন্দির হাওরের ৯৩, ৯৩ (ক) ও ৯৩ (খ) নং পিআইসির মাটি কাজ চলছে।

দিরাই উপজেলার টঙ্ঘর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল খান বলেন,‘ টাংনির হাওরের পিআইসি নং- ৬৯ (ক) ও ৬৯ (খ) ও হুরামন্দির হাওরের ৯৩, ৯৩ (ক) ও ৯৩ (খ) নং পিআইসির অর্ধেক কাজ এখনও শেষ হয়নি। বাঁধে মাটি কাটার কাজ চলছে। শাল্লা উপজেলার ১৮০ টি প্রকল্প রয়েছে। জেলার সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া কাজ এই উপজেলায়। অধিকাংশ বাঁধের মাটির কাজ শেষ পর্যায়ে। মাটির কাজ চলমান রয়েছে, ছায়ার হাওরের জোয়ারি বাঁধের কাছে ২টি ও মাউতির বাঁধের কাছে ২টি প্রকল্প, ভেড়ামোহনা হাওরের চাপতির বাঁধে ৩টি, উদগল বিল হাওরের ২টি, কালিকুটা হাওরের হাওয়ার খালের বাঁধে ২টি প্রকল্পের কাজ চলমান। কো¬জারের কাজ চলমান রয়েছে জয়পুর ও গিলাটিয়ার ভাঙায়। তবে কোন পিআইসিইর বাঁধেই ঘাস লাগানোর শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।

সুনামগঞ্জ পাউবোর পওর বিভাগ (১) এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন,‘ সার্বিকভাবে ৮৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, শেষ পর্যায়ের ১৫ ভাগ কাজ রয়েছে। বাঁধ নির্মাণে মাটির কাজ শেষ, তবে কিছু বাঁধে এখনও কমপেকশন ও স্লোপের কাজ শেষ হয়নি, বাঁশ, বস্তা, চাটাই ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে জিও টেক্সটাইল দেওয়া হয়নি। এসব কাজ শেষ না হলে শতভাগ সম্পন্ন বলা যাবে না। তবে আমারা দিন-রাত বাঁধ মনিটরিং করছি। কাজ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সুনামগঞ্জ পাউবোর পওর বিভাগ (২) এর নির্বাহী প্রকৌশলী খুশি মোহন সরকার বলেন,‘ দিরাই-শাল্লা, জগন্নাথপুরের হাওরগুলোর পানি নিস্কাশন হয়েছে অনেক দেরিতে। তাছাড়া বাঁধের উপযুক্ত মাটি নিয়ে আমাদের বেগ পোহাতে হয়েছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘ হাওরগুলোর পানি নিস্কাশনে দেরী হয়েছে। যার কারণে বাঁধের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। এখন জেলার অধিকাংশ পিআইসির কাজ শেষ। কিছু পিআইসির সামান্য মাটির কাজ বাকী রয়েছে। বাঁধে দ্রুত বাঁশ, বস্তা, চাটাই, জিওটেক্সটাইল ও ঘাস লাগানোর জন্য পিআইসিদের কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে সকল কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর