,

Prosanto-Kumar

সমবায় সচিব প্রশান্তের বিরুদ্ধে ৬৩২ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ

হাওর বার্তা ডেস্কঃ স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব প্রশান্ত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে ৬৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ডেনিম পলিমান ইন্ডাষ্ট্রিজ ও ডেনিম এরক্সপোট প্রসেজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (দুদক) হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এনামুল হকের নিকট হতে প্রতারণামূলকভাবে ২৫ লাখ টাকা অর্থ গ্রহণ করেছেন তিনি।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’প্রকল্পে প্রকল্প-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. প্রশান্ত কুমার রায়্সহ একটি চক্র বিভিন্ন সমিতির সদস্যদের নামে ঋণ দেখিয়ে ৬৩২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

সুনির্দিষ্ট এমন বেশকিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও দুদক উপপরিচাক মো. জুলফিকার আলীকে পৃথক ওই অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে কমিশন। যদিও পরবর্তীতে ওই অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য মো. জুলফিকার আলী নিয়োগ দিয়েছে কমিশন। দুদকের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়টি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বলেন, প্রশান্ত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ অনুসন্ধানে বেশ কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে কমিশনের আদেশে আমার অনুসন্ধানের অংশটুকু সম্প্রতি অপর অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব প্রশান্ত কুমার রায় সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ডেনিম পলিমান ইন্ডাষ্ট্রিজ ও ডেনিম এরক্সপোট প্রসেজিং লিমিটেডের এমডি হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এনামুল হকের নিকট হতে প্রতারণামূলকভাবে ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ওই ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন যে, তিনি দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয়ে তাঁর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় করেছেন। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব কেনার জন্য দেওয়া ওই অর্থ এখন ফেরত চেয়ে ওই সচিবকে এরই মধ্যে আইনি নোটিশ দিয়েছেন ওই ব্যবসায়ী। তবে সচিব এই অভিযোগকে মিথ্যা উল্লেখ করে নোটিশের উত্তরে বলেছেন, তিনি কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাল্টা আইনি নোটিশ পাঠিয়ে মানহানির দায়ে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন প্রশান্ত কুমার।

প্রশান্ত কুমার রায়কে দেওয়া এনামুল হকের আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের ২৩ জুলাই ড. প্রশান্ত কুমার রায় ডেনিম পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ডেনিম এক্সপোর্ট প্রসেসিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের এমডি পরিচয়ে এনামুল হকের সঙ্গে অংশীদারত্ব হস্তান্তর বা শেয়ার বিক্রির চুক্তি করেছেন। এনামুল হক ওই কোম্পানির অংশীদার হওয়ার বিনিময়ে দেড় কোটি টাকা ড. প্রশান্ত কুমারকে দেবেন। চুক্তির ৬ নম্বর শর্ত অনুযায়ী এনামুল হক বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পেতে চাইলে তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাবেন ও বোর্ড সভার অনুমোদনের মাধ্যমে সেই টাকা ফেরত পাবেন। এরই মধ্যে ২০১২ সালের ১০ আগস্ট এনামুল হক ওই দুই কোম্পানিকে ২৫ লাখ টাকা এবং বাকি টাকা ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেবেন।
চুক্তির এসব শর্তের কথা উল্লেখ করে এনামুল হক ২০১৫ সালের ২০ জুন সচিবকে দেওয়া আইনি নোটিশে বলেছেন, প্রশান্ত কুমারের ব্যক্তিগত ই-মেইল ঠিকানা prosantaroy@hotmail.com থেকে টাকা চাওয়ায় ডেনিম পলিমার লিমিটেডের নামে সোনালী ব্যাংক কারওয়ান বাজার শাখায় পরিচালিত ব্যাংক হিসাব নম্বর ৩৩০০৪৬৯৪-এ টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিনি ২৫ লাখ টাকা পাঠান। ওই টাকা হস্তান্তরের সময় প্রশান্ত কুমার ‘একটি বাড়ি একটি খামার’প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। ওই প্রকল্পের গাড়িতে করে এনামুল হক ও প্রশান্ত গাজীপুরে ডেনিম পলিমারের কারখানাতেও যান।

আইনি নোটিশে সংযুক্ত নথিতে আরা দেখা যায়, ড. প্রশান্ত কুমার রায় তাঁর ব্যক্তিগত ই-মেইল ঠিকানা থেকে পাঠানো চিঠিতে এনামুল হককে লিখেছেন: ‘অশেষ ধন্যবাদ। দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগে একটা ব্যবসায় চুক্তি করেছিলেন। সেখানে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে আর দেননি। চুক্তি খেলাপ হয়েছে কি? তারপর যে টাকা দিয়েছেন, তার সমপরিমাণ শেয়ার নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেটা যে ভুল প্রস্তাব, তা মনে হয় না। যাহোক, ভুল আমার, অপরাধও আমার, কারণ আমি সম্পৃক্ত ছিলাম।’

এরপর ওই বছরের ২৫ জুলাই প্রশান্ত কুমারের আইনজীবী বাসুদেব গুহ এনামুল হকের আইনি নোটিশের একটি জবাব দিয়েছেন। তাতে তিনি এনামুল হকের পাঠানো আইনি নোটিশের মাধ্যমে প্রশান্ত কুমারের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে উল্লেখ করে পাঁচ কোটি টাকা সমমূল্যের মানহানি ঘটেছে বলে নোটিশ দেন। সরকারি চাকরিবিধ লংঘন করে ব্যবসা করায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব প্রশান্ত কুমার রায়ের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দিয়েছিল দুদক। ওই বছরের ২২ সেপ্টম্বর দুদক সচিব আবু মোহাম্মদ মোস্তাকা কামাল সই করা চিঠিতে সচিবের বিরদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।

অপর অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ড. প্রশান্ত কুমার রায় দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সমিতির বেনামি সদস্যদের নামে ঋণ হিসেবে ৬৩২ কোটি টাকা দিয়ে আত্মসাত করেন।

সূত্র আরো জানায়, ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ৪০ হাজার ১২৩টি সমিতি গঠন করে ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৮টি পরিবারের মধ্যে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা। প্রকল্পের চক্রাকারে দেওয়া ঋণের পরিমাণ দাড়াঁয় এক হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৫০৮ কোটি টাকা।

অনাদায়ী পড়ে আছে এক হাজার ১৪১ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৬৩২ কোটি টাকা বেনামি সদস্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। যা আর ফিরে পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা জুলফিকার আলী ওই প্রকল্পের ওই আত্মসাতের এমন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। যা বর্তমানে যাচাই-বাছাই চলছে।

এ বিষয়ে দুদক সচিব আবু মো: মোস্তফা কামাল বলেন, যেহেতু বিষয়টি অনুসন্ধানাধীন। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। অনুসন্ধান কর্মকর্তার অনুসন্ধান শেষে এ বিষয়েটি গণমাধ্যমে জানানো যাবে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর