,

13

মানহীনতার ঘেরাটোপে টেলিভিশন নাটক ছ্যাকা খেয়ে বেঁকা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মা-খালারা বসে যেতেন টিভির সামনে। অপেক্ষার প্রহর গুনতেন কখন শেষ হবে রাত ৮টার বাংলা সংবাদ! সংবাদ শেষেই শুরু হবে ধারাবাহিক নাটক কিংবা সপ্তাহের একটা বিশেষ দিনের সাপ্তাহিক নাটক। একদৃষ্টিতে দেখতেন সেইসব নাটক। এক মুহূর্তের জন্যও সরাতেন না দৃষ্টি, কর্ণপাত করতেন না কোনো কথায়। চোখ, কান ও মনের তৃপ্তি নিয়ে নাটক দেখতেন। তাদের এই মধুর মিলনের বিচ্ছেদ ঘটতো যখন শুরু হতো রাত দশটার ইংরেজি সংবাদ। টানা দেড় ঘণ্টার এই জার্নিতে অনেকেই সে সময় অংশ নিতেন। পড়ার চাপ থাকলে শিক্ষার্থীরা তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে বসে যেত টেলিভিশনের সামনে। কখনো কখনো বাবা-মায়ের বকা খেয়েও তারা মজেছে নাটকের প্রেমে।

সেই সময় টেলিভিশন চ্যানেল ছিল কেবল একটি। আজ যুগের সঙ্গে চলে টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০-এর কোঠা পেরিয়ে। এত টিভি চ্যানেলে রোজ প্রচারিত হচ্ছে নাটক। এত টিভি চ্যানেল, এত এত নাটক কিন্তু সেই অতীতের সোনালি-রুপালি প্রেম আজ আর নেই। কেন নেই?

আজকের সময়ে নির্মিত নাটকগুলো নিয়ে দর্শক হতাশ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অযৌক্তিক গল্প, অভিনয় শিল্পীদের অদক্ষ অভিনয়, মানহীন নাম দিয়ে নাটক নির্মাণসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান নাটকগুলো। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’ নাটক কিংবা হুমায়ুন ফরিদী, আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তফাদের মতো অভিনেতাদের অভিনয় দেখা দর্শক থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের এক-তৃতীয়াংশ দর্শকের কাছে এই সময়ের নাটকগুলো পেয়েছে মানহীনতার তকমা। ‘রহিম বাদশার ডিজে বউ’, ‘চ্যাতা কাশেম’, ‘ছ্যাকা খেয়ে বেঁকা’, ‘প্লেবয়’, ‘চেলর ট্রিপ’, ‘দুদু মিয়া’, ‘সেন্ড মি নুডস’, ‘বেড সিন’, ‘সেই রকম বাকিখোর’, ‘চুটকি ভান্ডার’, ‘সেলিব্রেটি কাউ’, ‘ফালতু’, ‘ক্রেজি লাভার’, ড্যাশিং গার্লফ্রেন্ড’, ‘বংশগত পাগল’, ‘ছ্যাঁচড়া জামাই’, ‘প্রোটেকশন’ সহ নানা অশ্লীল নামে ভরপুর হয়ে আছে টেলিভিশন নাটক।
বাংলাদেশি নাটক।
নাটকের নাম বিড়ম্বনা ও মানহীন নাটক নির্মাণের বিষয় নিয়ে মেলার সঙ্গে কথা হয় ডিরেক্টর গিল্ডসের সভাপতি সালাহ উদ্দিন লাভলুর। হতাশার সঙ্গে তিনি জানান, ‘বর্তমান সময়ে যারা নাটক লিখছে, প্রযোজনা করছে এবং নির্মাণ করছে তাদের বেশির ভাগেরই আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যার ফলে তারা যাচ্ছেতাই নাম দিয়ে নাটক নির্মাণ করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। বাজে, মানহীন কন্টেন্টে নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। নাটক নির্মাণ করতে এসেছেন কিন্তু দর্শকের প্রতি, শিল্পের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাহলে মানহীন গল্পে নাটক নির্মাণ কেন হবে না?’

মানহীন নাম, গল্প ছাড়াও যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলোর নাটক নির্মাণে হস্তক্ষেপ। লেখক কী ধরনের গল্প লিখবে, সে গল্পে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করবে, নাটকের শুরু আর শেষ হবে কীভাবে সব কিছুই ঠিক করে দিচ্ছে এই বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলো। যার ফলে যেসব তরুণ মেধাবী নাট্য নির্মাতা রয়েছেন, যারা ভালো মানের নাটক নির্মাণ করতে চান কিন্তু বাজারে টিকে থাকার জন্য বাধ্য হচ্ছে মানহীন কন্টেন্ট নিয়ে নাটক নির্মাণে। এছাড়া টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন এজেন্সির কাছে জিম্মি হয়ে দায়সারাভাবে নির্মাণ করছে নাটক। এ বিষয়টি নিয়ে নির্মাতা ও ডিরেক্টর গিল্ডস সভাপতি বলেন, ‘টিভি চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ার জন্য তারা বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সাধারণ ব্যবসা আর শিল্প-সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেললে তো হবে না! চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন পেতে নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতিকে বিক্রি করে ফেলছে। যার ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা, সাধারণ দর্শকরা। ব্যবসায়ীরা ঠিকই তাদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছেন।’

এদিকে অভিনেতাদের অভিনয় মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডিরেক্টর গিল্ডসের সাধারণ সম্পাদক এস এ হক অলিক বলেন, ‘বর্তমান সময়ে যারা অভিনয় করছে তারা নিঃসন্দেহে ভালো অভিনয় করছে। তাদের একটি দর্শক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। যেটা কাজে লাগিয়ে আমাদের নির্মাতারা, টিভি চ্যানেল, বিজ্ঞাপন এজেন্সিগুলো যে নাটক নির্মাণ করছে তা গুটি কয়েক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যার ফলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ওপর যেমন প্রেসার পড়ছে তেমনই কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে একপ্রকার যেনতেনভাবেই তাদের অভিনয় করতে হচ্ছে। আমাদের আরো অনেক ভালো, গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছে। কিন্তু তাদের সেভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। তবে আমি মনে করি বাকিদেরও সুযোগ দেয়া উচিত।’

ডিজিটাল যুগে ইউটিউব বিনোদনের একটি অন্যতম মাধ্যম। সে মাধ্যমকে আমাদের নাট্য নির্মাতারা কাজেও লাগাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ইউটিউবে প্রচার হচ্ছে তাদের নির্মিত নাটকগুলো। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি নাটক ছাড়া বাকি নাটকগুলো সস্তা, মানহীন বলেই বিবেচ্য হচ্ছে। যার ফলে দর্শক সেই সব নাটক দেখছে না। তারপরেও থেমে নেই ইউটিউবের জন্য নাটক নির্মাণ। ভিউ অজুহাত দিয়ে বেড়েই চলছে ইউটিউবের নাটক। এ বিষয়টি নিয়ে ডিরেক্টর গিল্ডসের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘ইউটিউবের জন্য নাটক নির্মাণ হচ্ছে সেটা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু সে কাজটি ঠিকঠাক মতো হচ্ছে না। নাটকের ‘ভিউ’ অজুহাত তুলে অসংখ্য নাটক নির্মাণ হচ্ছে যার বেশিরভাগই মানহীন। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে সেসব নির্মাতাকে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকা। দায়িত্ববোধহীনভাবে এসব নাটক নির্মাণ করে তারা যেমন আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। তেমনই তাদের এসব সস্তা, মানহীন নাটকের কারণে আমাদের নাটক দিন দিন কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’

টেলিভিশন নাটক নির্মাতাদের সংগঠনের দুই প্রতিনিধি বললেন, ইউটিউবে লাগামহীনভাবে অশ্লীল নাম, কন্টেন্টে যে হারে নাটক নির্মাণ হচ্ছে তার লাগাম দ্রুতই ধরা উচিত। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধহীন নাট্য নির্মাতারা আমাদের নাটকের জন্য বিষফোড়া। এই বিষফোড়া থেকে নাটককে বাঁচাতে সরকারি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে টিভি চ্যানেল, মেধাবী নাট্যকার, নাট্য নির্মাতা, অভিনয় শিল্পীদের এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন টেলিভিশন নাটক নির্মাতাদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর