,

3

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন, জয়ের ছক কষছে দুই দল

হাওর বার্তা ডেস্কঃ  ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ের ছক কষছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে- এমন ধারণা নিয়েই আটঘাট বেঁধে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দল। ৯ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার। এর আগেই সিটি জয়ে নতুন কৌশলে পরিকল্পনা তৈরি করছেন নীতিনির্ধারকরা।

নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সমন্বয় টিমের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের নিয়ে গঠন করা হবে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি। গণসংযোগে নামবে দুই দলের শরিকরাও। নৌকা ও ধানের শীষের জয় নিশ্চিতে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রচারে থাকবেন বিশিষ্টজনরাও।

দুই দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দুই দলের প্রচারে থাকবে ভিন্নতা। গণসংযোগে নগরীর সমস্যাসহ স্থান পাবে জাতীয় ইস্যুও। রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারের চলমান নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড স্থান পাবে আওয়ামী লীগের প্রচারে।

উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত সামনে রেখে এগোবেন নৌকার দুই প্রার্থী। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি, অতীতে ভোটের অনিয়ম, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতিসহ সরকারের ব্যর্থতার ফিরিস্তি তুলে ধরবে বিএনপি। সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা।

৩০ জানুয়ারি দুই সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার প্রার্থী যাছাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন ৯ জানুয়ারি। পরের দিন প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। ওইদিন থেকেই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। এর আগের নির্বাচনেও তা-ই হয়েছে। কমিটির সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা ওয়ার্ড, থানাভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা চালাবেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরবেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আমরা মনে করি না। তারপরও আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা জনগণের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হব, জনগণের কাছে যাওয়ার একটি সুযোগ পাব বলে মনে করি।

তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় জয়ের জন্যই নির্বাচনে অংশ নেয়। জনগণ ভোট দিতে পারলে অতীতের মতো দুই সিটিতেও ধানের শীষের বিপুল বিজয় হবে। নির্বাচনী প্রচারে ভিন্নতা থাকবে জানিয়ে ফখরুল বলেন, নগরবাসীর সমস্যার পাশাপাশি জাতীয় ইস্যুগুলোও প্রচারে গুরুত্ব পাবে। গণসংযোগের কর্মকৌশল নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। দুই সিটির মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে তা চূড়ান্ত করা হবে।

আওয়ামী লীগ : ভোটারদের আস্থা বাড়াতে ও প্রচারে এগিয়ে থাকতে আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দুই সিটির বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি ভোটারদের মধ্যে তুলে ধরা হবে।

এর জন্য গঠন করা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক চূড়ান্ত না হলেও দুই সিটির জন্য সদস্য সচিব নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রাখা হচ্ছে। আজ শুক্রবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের সভায় দুই সিটির দুই সমন্বয় কমিটি চূড়ান্ত হতে পারে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের একাদিক সদস্য যুগান্তরকে জানান, ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব হচ্ছেন মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি। আর দক্ষিণে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর।

নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক এখনও চূড়ান্ত করা যায়নি। তবে সমন্বয়ক হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় আছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- দলের পেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, জাহঙ্গীর কবীর নানক ও আবদুর রহমান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য নেতারা সদস্য হিসেবে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে দক্ষিণে ড. আবদুর রাজ্জাক ও উত্তরে কর্নেল (অব.) ফারুক খান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের ধানমণ্ডির বাসভবনে জোটের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপসের পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ নাসিম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে ১৪ দলীয় জোট পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে। উত্তর সিটি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় পার্টির-(মঞ্জু) সাধারণ সম্পাদক শেখ সহিদুল ইসলাম। দক্ষিণে সাম্যবাদী দলের সম্পাদক দীলিপ বড়ুয়া। সাম্যবাদী দলের সম্পাদক দীলিপ বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, জোটের সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ করতেই আমরা নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এবারের নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করব।

দুই সিটি নির্বাচন পরিচালনা টিমে এবার বিভিন্ন পেশাজীবী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করবে আওয়ামী লীগ। দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে নৌকার প্রার্থীর প্রচারের কৌশল হিসেবেই এটি করতে যাচ্ছে দলটি। ইতিমধ্যে ঘরোয়া বৈঠক, কর্মিসভা ও মতবিনিময় সভা করছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের ১১ বছরে ঢাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগিয়ে চলছে। পাতাল রেল পরিকল্পনা, ঢাকার চারপাশে চক্রাকার বাস সার্ভির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদী-খাল দখল উচ্ছেদ ও সেখানে ‘ওয়াকওয়ে’ নির্মাণকাজগুলোও এবারের নির্বাচনে ‘ফোকাস’ করা হবে।

সূত্রটি আরও জানায়, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে দুই সিটির দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। এবারের ইশতেহারে আধুনিক ঢাকা বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থাকছে। উত্তর সিটির প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ইতিমধ্যে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মডেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। আর দক্ষিণ সিটিতে নৌকার প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজে বেশি মনোযোগী হওয়ার কথা বলছেন।

বিএনপি : দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকারের ব্যর্থতাগুলো সামনে এনে সিটি নির্বাচনের প্রচারে নামবে বিএনপি। আর কয়েকদিন পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে। তবে এখন থেকেই নতুন সব কৌশল নিয়ে পরিকল্পনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামতে ‘অলআউট’ প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। দুই সিটিতে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে গঠন করা হবে দুটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি।

কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাইয়ে উত্তরে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান ও দক্ষিণে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালামকে প্রধান করে সাত সদস্যের দুটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। উত্তর ও দক্ষিণে গণসংযোগেও এই কমিটির সদস্যরা থাকবেন। তবে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে উত্তরে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং দক্ষিণে মির্জা আব্বাসকে দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। যোগ করা হবে কেন্দ্রীয় আরও কয়েক নেতাকেও।

এসব কমিটিতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। এছাড়া স্থানীয় নেতাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে প্রতিটি কেন্দ্রে একটি করে কমিটি গঠন করা হবে। গণসংযোগ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতারা স্থানীয়দের সঙ্গে থাকবেন। এরপর স্থানীয় নেতারা কেন্দ্র পাহারাসহ ভোটের সার্বিক বিষয় দেখভাল করবেন।

বিএনপির পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের শরিকারও ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামবেন। গণসংযোগের লক্ষ্যে জোটের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ইতিমধ্যে জোটের নেতারা এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনাও করেছেন। জানতে চাইলে জোটের শরিক এলডিপির একাংশের সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ধানের শীষের পক্ষে আমরা মাঠে নাবব। গণসংযোগের জন্য জোটের পক্ষ থেকে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে।

২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকেও মাঠে নামাবে বিএনপি। ফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে। তারা ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। জোট ও ফ্রন্টের পাশাপাশি বিশিষ্টজনদেরও প্রচারে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনের সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগও করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

বিএনপি সূত্র জানায়, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দুই মেয়র প্রার্থী তাদের ইশতেহার তৈরির কাজ শুরু করেছেন। বাসযোগ্য নগরী গড়তে ১০০ বছরের ভিন্ন ভিন্ন মাস্টারপ্ল্যান থাকবে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনের ইশতেহারে। ‘বাসযোগ্য ঢাকা- ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকীকরণের পথে’ এ স্লোগানে মাঠে নামবেন তিনি।

উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ‘নতুন প্রজন্ম-নতুন ঢাকা’ এ স্লোগান সামনে রেখে প্রচার চালাবেন। গণসংযোগে এবার প্রাধান্য পাবে ডিজিটাল প্রচারণা। নির্বাচন কমিশনের ব্যয়সীমার মধ্যে থেকে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর প্রচারণা চালাবে বিএনপি।

তরুণ ভোটারদের টানতে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্নরূপে নিজেদের উপস্থাপন করবেন প্রার্থীরা। নিজস্ব ওয়েবসাইট, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, মোবাইল ফোনে চালানো হবে ডিজিটাল প্রচারণা। শুধু লেখা বার্তা নয়, ভিডিওচিত্রের মাধ্যমেও ভোট চাওয়া হবে। বেসরকারি টেলিভিশনে ধানের শীষে ভোট চেয়ে দুই সিটির জন্য ভিন্ন টিভিসি (বিজ্ঞাপন) প্রচারেরও পরিকল্পনা রয়েছে। দলের অফিসিয়াল পেজে নগরের বিভিন্ন সমস্যা এবং ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় মেয়রদের ব্যর্থতার চিত্র নিয়ে ডকুমেন্টরি প্রচার করা হবে। প্রচারণায় ভিন্ন মাত্রা আনতে তৈরি করা হয়েছে একটি ‘ক্লিপ সং’।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর