,

২৩

উন্নত মাছ উৎপাদনে ব্রম্নড ব্যবস্থাপনা

হাওর বার্তাঃ গুণগত মানসম্পন্ন কার্প জাতীয় ও দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশে স্থাপিত হয়েছে ব্রম্নড ব্যাংক। সরকারি ও বেসরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে গুণগত মানসম্পন্ন ব্রম্নড মাছ ও পোনা উৎপাদনে ব্রম্নড ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বৃদ্ধি পাবে। ব্রম্নড মাছ বলতে প্রাপ্ত বয়স্ক কৌলিতাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন প্রজননক্ষম পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে বুঝায়। হ্যাচারিতে গুণগত পোনা উৎপাদনের পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নতমানের ব্রম্নড মাছ।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩য় এবং চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে ৫ম স্থান অর্জন করেছে। মৎস্য খাতের এই সমৃদ্ধির যুগেও, বাংলাদেশ যখন মৎস্য সেক্টরে স্বয়ংসম্পূর্ণ তখনও কিছু কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যার মধ্যে অন্যতম (উন্নত গুণসম্পন্ন পোনা উৎপাদনে জন্য) গুণগত মানসম্পন্ন ব্রম্নড মাছের অপর্যাপ্ততা সেই সঙ্গে দেশীয় ছোট প্রজাতির মাছের (এসআইএস) বিলুপ্তির আশঙ্কা।

এ সব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে মৎস্য অধিদপ্তর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ব্রম্নড ব্যাংক স্থাপন প্রকল্প (৩য় পর্যায়)’ হাতে নেয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ও বেসরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে গুণগত মানসম্পন্ন ব্রম্নড মাছ ও পোনা মাছ উৎপাদন এবং উন্নত কৌলিতাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন কার্প ও দেশীয় ছোট প্রজাতির (এসআইএস) এর ব্রম্নড স্টক তৈরির মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্যে প্রাকৃতির উৎসের রেণু হতে (হালদা, পদ্মা, যমুনা নদী) ৩৫ মে. টন কার্প ব্রম্নড তৈরি করা হয়েছে এবং এসব কার্প ব্রম্নড হতে ৫০ মে. টন রেণু উৎপাদন করা হয়েছে- যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে ৩০ লাখ কার্পের পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়াও গুলসা, পাবদা, শিং ও মাগুরের ০.২৮ মে. টন এসআইএস ব্রম্নড তৈরি করে সেখান থেকে ৩.১ লাখ পোনা উৎপাদন করা হয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় এ বছর প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প ও বিগহেড কার্পের সর্বোচ্চ জেনেটিক গুণসম্পন্ন ৩৯ হাজার পোনা চীন হতে আমদানি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪০ বছর আগে আশির দশকে বিদেশ থেকে কিছু কিছু প্রজাতির মাছ আমদানি করা হয়েছিল মাছ চাষ উন্নয়নে ব্রম্নড মাছ ও পোনা মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে। যার মধ্য এই তিনটি প্রজাতির মাছ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কম খরচ ও উৎপাদন বেশি হওয়ায় এই প্রজাতির মাছগুলো ব্যাপকভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এত বছরের ব্যবধানে এই প্রজাতিরগুলোর মধ্যে অন্তঃপ্রজনন হার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরবর্তী সময়ে উৎপাদিত পোনাগুলোর বৃদ্ধির হার ও গুণগতমান কমতে থাকে।

ভবিষ্যতের জন্য গুণগতমানের পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যে তিনটি প্রজাতির প্রায় ৩৯ হাজার পোনা আমদানি করা হয়েছে। যেগুলোকে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্রম্নড মাছে পরিণত করা হচ্ছে। পোনাগুলোকে আমদানির সময় এদের আকার ছিল ৩-৫ সেন্টিমিটার। মাছগুলো ‘আমুর’ নদীর যেটা চীন ও রাশিয়ায় মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাছগুলো তিন বছর খামারে প্রতিপালন করার পর ব্রম্নড মাছে পরিণিত হবে। পরবর্তী সময়ে মাছগুলো দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি খামারে ছড়িয়ে দেয়া হবে। বু্রড ব্যাংক স্থাপন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ৭টি বিভাগের ২৩টি জেলার ২৭টি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।ব্রম্নড মাছ ব্যবস্থাপনা
ব্রম্নড মাছের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বা প্রতিপালনের ওপর গুণগতমান সম্পন্ন ব্রম্নড উৎপাদন নির্ভরশীল। ব্রম্নড মাছ পুকুরে চাষ করার জন্য পুকুরের আকার ০.২৫ হেক্টর হতে ০.৫ হেক্টর, পুকুরে পানির গভীরতা ১.৫ থেকে ২.০০ মিটার (৫-৭ ফুট) এবং পুকুরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুকুর প্রস্তুত করতে পুকুরের তলা শুকিয়ে অতিরিক্ত কাদা অপসারণ করতে হবে। প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। তবে মাটির পিএইচ জেনে চুন প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া প্রাকৃতির খাবারের প্রাচুর্যতা বৃদ্ধির জন্য জৈব এবং অজৈব উভয় প্রকার সার ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। পুকুরের পানি ও মাটির গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে সার প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে ইউরিয়া প্রতি শতাংশে ১৫০-২৫০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫-১২৫ গ্রাম, এমপি ৫০-৭৫ গ্রাম, কম্পোস্ট ২-৩ কেজি এবং সরিষার খৈল ১-২ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। তবে ব্যবস্থাপনার ওপর এই মাত্রা ভিন্ন হতে পারে
মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা
পুকুর হতে ব্রম্নড মাছ ধরা ও পরিবহন কাজটি ভোরবেলা করতে হবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিবহন ট্যাংক বা ফাইবার গস্নাসে বরফ ব্যবহার করা যেতে পারে। তা ছাড়া ব্রম্নড মাছ মজুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত ব্রম্নড মাছ প্রতি হেক্টরে ১৮০০-২০০০ কেজি মজুদ করা শ্রেয়। পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে ব্রম্নডের মজুদ ঠিক করতে হবে। এ ছাড়া মজুদের হার শতকরা হিসেবে সিলভার কার্প ২০%, কাতলা/বিগহেড ১০%, রুই ৩৫%, মৃগেল ২৫%, গ্রাসকার্প ৫%, সরপুটি ৫% মোট ১০০%। পুকুরে মজুদকৃত পুরুষ ও স্ত্রী মাছের অনুপাত ১:১ হওয়া বাঞ্চনীয়।
মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা
ব্রম্নড মাছের প্রাকৃতিক খাবারের প্রাচুর্যতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণত পুকুরে প্রতি সপ্তাহে প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ৫০-৭৫ গ্রাম, টিএসপি ২৫-৩৫ গ্রাম, এমপি ১৫-২৫ গ্রাম, কম্পোস্ট ১-২ কেজি এবং সরিষার খৈল ১-২ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। তবে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর ভিত্তি করে এই মাত্রা কম বেশি হতে পারে। সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করলে তা অবশ্যই সুষম হতে হবে এবং ভিটামিন, প্রোটিন, খনিজ লবণযুক্ত হতে হবে। সম্পূরক খাদ্যের উপাদান গমের ভুসি বা চাউলের কুড়া (অটো রাইস) শতকরা ৪৫ ভাগ, সরিষার খৈল শতকরা ৩০ ভাগ, ফিশ মিল শতকরা ১৫ ভাগ, আটা শতকরা ৫ ভাগ এবং চিটাগুড় শতকরা ৫ ভাগ মিলিয়ে মোট ১০০ ভাগ।
ব্রম্নড মাছের পুকুরে পানি ব্যবস্থাপনা
পানি ও মাটির গুণাগুণ ব্রম্নড মাছের পরিপক্বতা ত্বরান্বিত করে। ব্রম্নড পুকুরের পানি মাঝে মাঝে আংশিক পরিবর্তন করা উচিত। ব্রম্নড মাছের পুকুরে সম্ভব হলে মাসে এক দুইবার আংশিক পানি অপসারণ করে জীবাণুমুক্ত গভীর নলকূপের পানির ঢুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পানি পরিবর্তন সম্ভব না হলে এরেটর ব্যবহার করেও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পিএইচ মিটার, ডিও মিটার দিয়ে পানির মান পরীক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া পুকুরের পানির তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, পিএইচ ৬.৫ থেকে ৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দ্রবীভূত অক্সিজেন ৫.৫ থেকে ৬.৫ মিগ্রা/লিটার, অ্যামোনিয়া ০.০৫ মিগ্রা/লিটারের কম, আয়রন ০.২০ মিগ্রা/লিটারের কম, কার্বন ডাই-অক্সাইড ৫ থেকে ১৫ মিগ্রা/লিটার এবং হার্ডনেস ১৫০-৪০০ মিগ্রা/লিটারে রাখা ভালো, তবে ব্যবস্থাপনার পের এই মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
ব্রম্নড মাছের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
সুস্থ-সবল রোগবালাই মুক্ত ব্রম্নড প্রজননের জন্য অত্যাবশ্যক। গুড অ্যাকোয়া কালচার প্র্যাকটিস অনুসরণ করতে হবে এবং চুন, সার ও সুষম খাবার সঠিক হারে প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে নিয়মিত জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাসহ পুকুরে হররা টেনে দূষিত গ্যাস অপসারণে ব্যবস্থা করতে হবে।
ব্রম্নড মাছ আরগুলাস দ্বারা আক্রান্ত হলে একর প্রতি পুকুরে গড়ে তিন ফুট পানি থাকলে ১০০ মিলি হারে ‘রিপিকড’ সন্ধ্যাবেলা প্রতি সপ্তাহে একবার করে তিন সপ্তাহ প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ছাড়া ০.৫ পিপিএম হারে ডিপটারেক্স অথবা ০.২৫ পিপিএম হারে সুমিথিয়ন ৫-৭ দিন অন্তর অন্তর তিনবার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
ব্রম্নড ব্যাংক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সিরাজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মৎস্য চাষ ও চাষভিত্তিক জলাশয় ব্যবস্থাপনার ফলে গুণগতমানের পোনার চাহিদা হ্যাচারি উৎপাদিত পোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গত দুই দশকে হ্যাচারিতে রেণু ও পোনা উৎপাদনে উলেস্নখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের কারিগরি জ্ঞান ও সচেতনতার অভার, অধিক মুনাফার চিন্তাচেতনা, সঠিক প্রযুক্তি অনুসরণ না করা, অন্তঃপ্রজনন ও সংকরায়ন সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার গুণগতমান বেশিরভাগই নিম্নমানের। ফলে মাছের উৎপাদন কাক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়ায় মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক ব্রম্নড ব্যাংক স্থাপন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, উন্নত কৌলিতাত্ত্বিক গুণাগুণসম্পন্ন ব্রম্নড মাছ ও মৎস্যবীজ উৎপাদনের জন্য ব্রম্নড ব্যাংক প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক।
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসেব মতে, দেশে ১৪ লাখ ১১ হাজার ৮৪৮ মেট্রিক টন কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন হয়েছে। এটা মোট মাছ উৎপাদনের ৩৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এর মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেলের মতো দামি কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৭ মেট্রিক টন- যা মোট উৎপাদনের ১৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প ও ব্রিগ হেড কার্পসহ এ জাতীয় মাছের উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৭৮ মেট্রিক টন- যা মোট উৎপাদনের ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ।
ব্রম্নড ব্যাংকের মাধ্যমে মাছ চাষ করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান মন্ডল বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টর অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ দেশের মৎস্য চাষকে সমৃদ্ধ ও টেকসই করার জন্য গুণগতমানসম্পন্ন পোনার দরকার। আর এর জন্যই প্রয়োজন গুণগত মানসম্পন্ন ব্রম্নড মাছ। বাংলাদেশ সরকারের ব্রম্নড ব্যাংক স্থাপন প্রকল্পটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রকল্পটির সম্প্রসারণ ও সার্বিক উন্নয়ন এ দেশের মৎস্য উৎপাদনকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
লেখক: গণযোগাযোগ কর্মকর্তা ও সহকারী প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ভবন, রমনা।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর